জুয়েল আনান্দ্ | ঢাকা :
রাজধানীসহ সারাদেশে কিউলেক্স ও এডিস মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে। সূর্যাস্তের পর তো বটেই, এখন দিনের বেলাতেও মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ জনজীবন। বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত কিংবা গণপরিবহন—কোথাও মিলছে না স্বস্তি। মশার এই ভয়াবহ বিস্তারে অতিষ্ঠ নাগরিকরা একে ‘মশার রাজত্ব’ বলে অভিহিত করছেন।
মশার উপদ্রবে জনজীবন বিপর্যস্ত
বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই মশার ঘনত্ব কয়েক গুণ বেড়েছে। বিশেষ করে ড্রেন, ডোবা এবং ময়লাযুক্ত জলাশয়গুলো পরিষ্কার না করায় সেখানে মশার প্রজনন বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ভুক্তভোগীদের মতে, কয়েল, স্প্রে বা ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করেও মশার আক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, “আগে শুধু রাতে মশারি টানাতে হতো, এখন দিনের বেলাতেও অফিসে বসে কাজ করা দায় হয়ে পড়েছে। কয়েল জ্বালিয়েও লাভ হচ্ছে না।”
তথ্য ও উপাত্তের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কীটতত্ত্ববিদদের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে:
ঘনত্ব: গত বছরের তুলনায় এ বছর মশার লার্ভার উপস্থিতি প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
রোগবালাই: চলতি মাসে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রজননস্থল: ঢাকার প্রায় ৪৫% নির্মাণাধীন ভবন এবং অব্যবহৃত ছাদবাগানে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।
সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা
দুই সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত ফগিং এবং লার্ভিসাইডিং (মশার ওষুধ ছিটানো) করার দাবি করলেও সাধারণ মানুষের অভিযোগ তার সুফল মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, থেমে থেমে বৃষ্টি এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে মশার বংশবিস্তার দ্রুত হচ্ছে। তবে জনবল সংকট এবং জলাশয় পরিষ্কারে সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছেন অনেকে।
বিশেষজ্ঞদের মত
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, কেবল ফগিং বা ধোঁয়া দিয়ে উড়ন্ত মশা মেরে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং উৎস মূলে (Source reduction) আঘাত করতে হবে। তাদের পরামর্শ:
জলাবদ্ধতা নিরসন: ড্রেন ও ডোবা নিয়মিত পরিষ্কার করা।
জনসচেতনতা: নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখতে নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করা।
কার্যকর ওষুধ: আধুনিক ও পরীক্ষিত কীটনাশক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
মশার এই অসহনীয় উৎপাত থেকে মুক্তি পেতে সিটি কর্পোরেশনের ক্রাশ প্রোগ্রাম এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার দাবি এখন সাধারণ নাগরিকদের মুখে মুখে।
রাজধানীর মশা পরিস্থিতি ২০২৬
১. মশার লার্ভার ঘনত্ব (বিগত ৩ বছরের তুলনা)
একটি গ্রাফ বা চার্টের মাধ্যমে এটি দেখানো যেতে পারে:
২০২৪: ২০% (স্বাভাবিক)
২০২৫: ২৫% (উদ্বেগজনক)
২০২৬ (বর্তমান): ৩৫% (ভয়াবহ)
২. প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র (উৎস)
একটি পাই চার্ট (Pie Chart) বা আইকন দিয়ে এই অংশটি ফুটিয়ে তোলা যায়:
নির্মাণাধীন ভবন: ৪৫%
পরিত্যক্ত টায়ার ও পাত্র: ২০%
অপরিচ্ছন্ন ড্রেন ও ডোবা: ২৫%
অন্যান্য (ছাদবাগান ইত্যাদি): ১০%
৩. সাধারণ লক্ষণের অ্যালার্ট (ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া)
🌡️ উচ্চ জ্বর: ১০৩-১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত।
🤕 তীব্র মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা।
🦴 ** হাড় ও পেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা।**
🩸 র্যাশ বা রক্তপাত (জরুরি অবস্থা)।
৪. কী করবেন এবং কী করবেন না?
দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করুন। খোলা পাত্রে ৩ দিনের বেশি পানি জমিয়ে রাখবেন না।
ফুল হাতা পোশাক পরুন। বাড়ির চারপাশ আবর্জনায় পূর্ণ রাখবেন না।
সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার করুন। সিটি কর্পোরেশনের ধোঁয়ার ওপর পূর্ণ নির্ভর করবেন না।
৫. নাগরিক রেটিং (মশা নিধন কার্যক্রম)
একটি কুইক পোল বা সার্ভে চিত্র:
অসন্তোষজনক: ৮০%
মোটামুটি: ১৫%
সন্তুষ্ট: ৫%
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক উপদেষ্টা,কীটতত্ত্ববিদ ডা. মো. আনিসুর রহমানের মতে
“বর্তমানে মশার যে ভয়াবহ উপদ্রব প্রধানত কিউলেক্স মশা। এই মশা নোংরা পানি এবং বদ্ধ ড্রেনে বংশবৃদ্ধি করে।
সিটি কর্পোরেশন যে ফগিং (ধোঁয়া ছিটানো) করে, তা কেবল উড়ন্ত মশা মারার জন্য। কিন্তু মূল সমস্যা হলো লার্ভা বা মশার ডিম।
যতক্ষণ পর্যন্ত নর্দমা এবং ডোবাগুলো পরিষ্কার করে লার্ভিসাইডিং (লার্ভা মারার ওষুধ) কার্যকরভাবে না করা হবে, ততক্ষণ এই ভোগান্তি কমবে না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎস নিধনই একমাত্র সমাধান।”

